আমি যেতে চাই না, এই মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না: বিদায়ী বক্তৃতায় মেসি



দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের বর্ণিল পথচলা শেষে আকাশি-সাদা জার্সিকে চিরতরে বিদায় জানালেন বিশ্ব ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ঘরের মাঠ এস্তাদিও মনুমেন্তালে জয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন বিশ্বকাপজয়ী এই কিংবদন্তি। ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে এক আবেগঘন বিদায়ী ভাষণ দেন তিনি, যেখানে উঠে এসেছে তার দীর্ঘ লড়াই, সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা।

ভাষণের শুরুতেই আবেগাপ্লুত মেসি স্মরণ করেন তার বাবাকে। ভারী কণ্ঠে তিনি বলেন, “আজ কী বলব, সত্যিই বুঝতে পারছি না। মনের ভেতর এত আবেগ, এত কিছু একসঙ্গে ঘুরছে। সবার আগে আমার বাবার কথাই মনে পড়ছে।” ২০ বছরের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে জড়ানোকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, কঠিনতম সময়েও তিনি কখনও লড়াই থামাননি বা দলের পাশ থেকে সরে যাননি।

গত বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মেসি জানান, শেষ বিশ্বকাপটি তার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে ব্যাপক চাপের ছিল। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষের ম্যাচটি তাদের পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিয়েছিল। তারপরও সতীর্থদের নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার পাশে যে সতীর্থই খেলেছে, এই জার্সির জন্য সে সব সময় তার সর্বস্ব দিয়েছে। ওরাই আমাকে আমার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, কোপা আমেরিকা বা ফিনালিসিমা—সব জায়গায় তারা নিজেদের উজাড় করে দিয়েছে। মাঠে ও মাঠের বাইরে তাদের সঙ্গে সময় কাটানো আমার জন্য ছিল বিশাল সম্মানের।”

বিশ্বজুড়ে ও দেশের মাটিতে সমর্থকদের অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা স্মরণ করে মেসি বলেন, “যেখানেই খেলতে গিয়েছি, স্টেডিয়াম ছিল পরিপূর্ণ। মানুষ অনেক কষ্ট করে এসেছে, তারপরও সব সময় মনে হয়েছে, আমরা যেন নিজেদের মাঠেই খেলছি।” বিশ্বকাপ জয়ের পর এই মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে ফিরে খেলার দিনটিকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম আনন্দের দিন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, সেই স্মৃতি আজও তাকে আবেগাপ্লুত করে।

জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে না নামার কষ্ট প্রকাশ করে মেসি বলেন, “আজ আবার এই মাঠে ফিরে এসে, আমি সম্ভবত আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কষ্টের দিনটা অনুভব করছি। কারণ আজই জাতীয় দলকে বিদায় বলছি। জাতীয় দলের রং গায়ে জড়িয়ে মাঠে নামাটা আমি ভীষণ মিস করব। তবে এখন থেকে আমি থাকব ওই পাশে। গ্যালারিতে। সামনে যা আসবে, তার জন্য এই তরুণদের সমর্থন করব।”

ভবিষ্যতে দলের কঠিন সময়ে সমর্থকদের আরও বেশি পাশে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল তৈরি করতে হয়, কারণ এমন কিছু মানুষ আছে যারা জাতীয় দলকে ব্যর্থ দেখতে চায়। কঠিন সময়, খারাপ সময়টাই আসলে বলে দেয় একটা দলের ভিত কতটা শক্ত।”

ভাষণের শেষ পর্যায়ে এসে এই মহাতারকা আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। চিরচেনা সবুজ গালিচা ছেড়ে যাওয়ার বেদনায় তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, জীবনে আর কখনো এত বেশি কথা বলেছি কি না, জানি না। আমি যেতে চাই না। এই মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না। শুধু আপনাদের একটা কথা বলতে চাই, আমি আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। আর ঈশ্বরের কাছে আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ যে আমি একজন আর্জেন্টাইন। আমি আর্জেন্টাইন, এটাই আমার গর্ব।”

আপ্লুত দর্শকদের ভালোবাসার জবাবে “আপনাদের সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ” বলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক সোনালী অধ্যায়ের মহাকাব্যিক সমাপ্তি টানেন লিওনেল মেসি।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চট্টগ্রাম-৩ আসনের সাবেক এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা গ্রেপ্তার